ঢাকা, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫

২০ চৈত্র ১৪৩১, ০৫ শাওয়াল ১৪৪৬

শিরোনাম

Scroll
বিচার বানচালে পতিত সরকারের অর্থ ব্যয়ের তথ্য মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর
Scroll
ট্রাম্পের প্রশাসনে থাকছে না মাস্কের চাকরি
Scroll
মার্কিন বিমানবাহী রণতরীতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হুতির
Scroll
ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের শুল্ক গণনা পদ্ধতিই ‘অন্যায্য’, বাংলাদেশসহ গরিব দেশগুলোর জন্য বিপর্যয়কর
Scroll
ট্রাম্পের শুল্কনীতি আরোপে বাণিজ্য যুদ্ধের শঙ্কা, বিশ্বনেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
Scroll
দেশকে বদলাতে পরিচালনা পদ্ধতি পাল্টাতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা
Scroll
বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসাল যুক্তরাষ্ট্র
Scroll
সব ধরনের বিদেশি গাড়ি আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক বসালেন ট্রাম্প
Scroll
মিয়ানমারে ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৩০০৩, ত্রাণ সরবরাহে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা জান্তার
Scroll
বিমসটেকের ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকা ছাড়লেন প্রধান উপদেষ্টা

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের আশঙ্কা

উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রাজধানীতেই মারা যেতে পারে ৫ লাখ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১:০৭, ৩০ মার্চ ২০২৫

উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রাজধানীতেই মারা যেতে পারে ৫ লাখ মানুষ

মিয়ানমারের মান্দালয়ে উৎপত্তি হওয়া ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক ভূমিকম্প শুক্রবার একযোগে অনুভূত হয়েছে ছয়টি দেশে। উৎপত্তিস্থল থেকে দূরত্বের কারণে বাংলাদেশে কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও বিপর্যয় নেমে এসেছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে। যদি বাংলাদেশের হিসাব করা হয়। গত ৯০ দিনে বাংলাদেশের আশেপাশে মৃদু তীব্র মাত্রার ৫০টিরও বেশি ভূমিকম্প হয়েছে। বিগত ১৫ বছরে দেশে ১৫০টির বেশি ছোট বড় ভূমিকম্প হয়েছে।

ক্রমান্বয়ে বাড়ছে শঙ্কা

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এবং কাছাকাছি এলাকায় ২৮টি ভূমিকম্প হয়। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১টি এবং গত বছর দেশে ও আশপাশে ৫৩টি ভূমিকম্প হয়েছে। এটি ছিল আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ৯০ দিনে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারে মৃদু ও বিভিন্ন মাত্রার ৬০টির বেশি ভূমিকম্প হয়েছে। ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা

১৫০ বছরের সাইকেল হিসাবে বাংলাদেশে এখন ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা খুবই জোরালো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি ১০০-১৫০ বছর পরপর ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আসে। আর প্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পরপর আসে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প। ১৫০ বছরের সাইকেল হিসাবে বাংলাদেশে এখন ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা খুবই জোরালো হয়েছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে সিলেট

ভূতত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন, সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৮ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়া মতো শক্তি জমা হয়ে আছে। যে কোনো সময় সে শক্তি বের হয়ে আসতে পারে। এতে সিলেট ও চট্টগ্রাম ছাড়াও সব থেকে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে রাজধানী। তারা বলছেন, সব থেকে বেশি ঝুঁকিতে আছে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ। এরপর মাঝারি ঝুঁকিতে রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগ। আর কম ঝুঁকিতে দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা ও বরিশাল বিভাগ। বিগত কয়েক শ বছরের ইতিহাসে এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে সিলেট পর্যন্ত বিগত ৪০০ থেকে হাজার বছরে কোনো বড় ধরনের ভূমিকম্প না ঘটায় এসব স্থানে শক্তি জমা হয়ে আছে।

ঢাকার ঝুঁকি

দুর্যোগ সূচকে বিশ্বে ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরে তালিকায় রয়েছে ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার মাটি দুই ধরনের। সদরঘাট থেকে সোজা গাজীপুরের মধুপুর পর্যন্ত অংশটি প্লাইস্টোসিন আমলের লাল মাটি দিয়ে গঠিত। এ ধরনের মাটির গঠন খুবই শক্তিশালী। বুড়িগঙ্গা নদী থেকে শুরু করে পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এয়ারপোর্ট, টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারের একাংশ পুরোটাই এ ধরনের শক্ত ভূমি। কিন্তু ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ, হেমায়েতপুর, পূর্বাচলের একাংশ, নারায়ণগঞ্জের একাংশের ভূমি সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি শ্রেণীর। এটি এখনো গঠিত হচ্ছে। এখানে ৩০-৪০ মিটার পর্যন্ত পাইলিং দিলেও নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকেই যায়।

অশনিসংকেত 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে। এসব ভূমিকম্পের মধ্যে মাঝারি থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পও রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত এসব ভূমিকম্পে বড় মাত্রার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। না হলেও দেশের চারদিকে ভয়াবহ ভূমিকম্প বলয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারত এবং মিয়ানমার বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব এলাকা থেকে প্রায় সময়ই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উত্পত্তি হচ্ছে। এর আঘাত সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর। বিশেষ করে সিকিম, উত্তর-পূর্বে আসাম ও এর আশপাশের এলাকা থেকে এখন প্রায়ই ভূমিকম্প সৃষ্টি হচ্ছে।

সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কেমন হতে পারে?

সম্প্রতি রাজউকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৪০.২৮ থেকে ৬৫.৮৩ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে। এতে সময়ভেদে প্রাণহানির সংখ্যা ব্যাপক হতে পারে-ভোরে হলে ২.১ থেকে ৩.১ লাখ, দুপুরে ২.৭ থেকে ৪ লাখ এবং রাতে হলে ৩.২ থেকে ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে, সিলেটে যদি ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে ঢাকায় ৪০,৯৩৫ থেকে ৩ লাখ ১৪ হাজার ভবন-অর্থাৎ মোট ভবনের ১.৯১ শতাংশ থেকে ১৪.৬৬ শতাংশ-ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাজউকের আওতায় ঢাকায় মোট ভবনের সংখ্যা ২১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি, যার মধ্যে ৫ লাখ ১৪ হাজার কংক্রিটের তৈরি। রাজউকের জরিপ করা ৩,২৫২টি ভবনের মধ্যে ৪২টিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছে।

মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৪৯.৬ শতাংশ প্রধান সড়ক, ৫৯.৪ শতাংশ নগর সড়ক, ৯৬.২২ শতাংশ প্রধান সেতু এবং ৯৬.৭৯ শতাংশ পর্যন্ত নগর সেতু ধসে পড়তে পারে। পরিবহন খাতে ক্ষতি হবে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনে ৮৮৭ মিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে ২৭.১ মিলিয়ন ডলার।

ঝুঁকিতে স্কুল-হাসপাতাল

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান জানান, অনেক সরকারি স্থাপনা, স্কুল, হাসপাতাল-এসব প্রতিষ্ঠানও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে। কিছু কিছু জায়গায় তো ভূমিকম্প ছাড়াই ভবন ধসে যাচ্ছে। তার মধ্যে যদি ভূকম্পন হয়েই যায়, তাহলে না আছে পর্যাপ্ত উদ্ধার ব্যবস্থা, না আছে খালি জায়গা; যেখানে মানুষ গিয়ে দাঁড়াবে। সাড়ে তিন হাজার ভবনকে ভূমিকম্পে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা পরীক্ষা করে লাল, আম্বার, হলুদ ও সবুজ হিসাবে চিহ্নত করা হয়েছিল। তাতে দেশে গার্মেন্টসের পাকা দালানের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি দেশের স্কুল বিল্ডিংয়ের মধ্যেও ৩৫ শতাংশ ভূমিকম্পের জন্য সহনীয় মেলেনি। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, দেশে মোট পাকা দালানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ভূমিকম্পের প্রবল ঝুঁকিতে আছে।

সর্বনাশ যেভাবে ডেকে আনা হচ্ছে

প্রকৃতি আমাদের বারবার সতর্ক করছে। কিন্তু আমরা সাবধান হচ্ছি না। ফলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আমাদের ঘিরে রাখছে। বিল্ডিং কোড মেনে না চলা, বন উজাড়, পাহাড় কেটে ধ্বংস করাসহ নানা উপায়ে আমরা যেন ভূমিকম্প নামক মহাবিপদকে ডেকে আনছি। ভূমিকম্প হলে বিদ্যুতায়িত হয়ে অনেক জায়গায় আগুন লাগারও আশঙ্কা আছে। তার মানে এ নগরী আগুন, ভূমিকম্পসহ নানাবিধ ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে ঝুঁকি কমানোর জন্য কোনো প্রস্তুতি সরকার বা রাষ্ট্র নেয়নি। উল্টো আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে বারবার নগর পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। সরু রাস্তায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে নগরীকে আরো বাসযোগ্যহীন করে তুলছে।

 

কোনো ব্যবস্থা কি আছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিষয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। যার যার ফ্ল্যাট বা বিল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে রেক্টিফাই করে নিলেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কোন কোন বিল্ডিং ভূমিকম্প সহনীয় নয়। সেই রিপোর্ট যথাযথ কর্তৃপক্ষ বা রাজউককে দিলেই কাজটি হয়ে যায়। একটি ফ্ল্যাট রেক্টিফাই করতে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হবে না। নেপালে ২০১৫ সালে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের প্রভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার। সেই সিদ্ধান্তও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া ওই বৈঠকে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এনডিএমআইএস) নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরির সিদ্ধান্তও হয়েছিল। এটিও আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের উদাহরণ

১৮৬৯ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে রিখটার স্কেলে ৭-এর বেশি মাত্রার পাঁচটি ভূমিকম্পে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

১৮৯৭ সালে মেঘালয়ের কাছাকাছি ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এই ভূমিকম্পে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কলকাতার ভবনগুলো গুরুতর ফাটল ও ধসের সম্মুখীন হয়েছিল, তার মধ্যে আহসান মঞ্জিল ছিল অন্যতম। 

১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর চট্টগ্রামে ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটে, যার প্রভাবে শহরের নানান স্থাপনায় ফাটল ধরে। 

২০১৫ সালে নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে নিহত হন প্রায় ৯ হাজার মানুষ।

আরও পড়ুন