শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১:০১, ২ এপ্রিল ২০২৫
ইন্ডিয়া টুডের ‘নাথিং বাট ট্রু’ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামকে। সেখানে মাহফুজ আনাম বাংলাদেশ নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক ছিলেন রাজ চেঙ্গাপ্পা।
রাজ তাঁর দৃষ্টিকোন থেকে বর্তমান বাংলাদেশের কিছু পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে রাজ বলেন, গত বছরের আগস্টে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। এর পর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় নিপীড়ন প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ এনেছে এবং তাদের জীবন ও সম্পত্তির সুরক্ষা চেয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে ‘ইসলামিকিকরণ বৃদ্ধি’ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে দেশটির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তিনি আরো বলেন, ‘ইউনূস সরকার দাবি করছে, তারা অর্থনৈতিক পতন রোধ করতে সক্ষম হয়েছে এবং রাজনৈতিক, বিচার বিভাগীয় ও শাসন সংস্কার চালু করছে। তবে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, বিদেশি বিনিয়োগের অভাব, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এবং দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব সমস্যাগুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।’
রাজ আরো বলেন, এ ছাড়া অনেকের ধারণা যে ইউনূস মৌলবাদী ইসলামপন্থী ছাত্রগোষ্ঠীর হাতের পুতুল, যারা সরকারের মৌলিক নীতিগুলো পরিবর্তন করছে। এটি অন্যতম প্রধান সমালোচনার বিষয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সতর্ক করে দিয়েছেন, দেশ ‘নৈরাজ্যের অবস্থায়’ রয়েছে এবং যদি রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিরতা চলতে থাকে, তাহলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
তিনি আরো বলেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বিমসটেক সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সম্ভাব্য এক বৈঠকের আলোচনা চলছে। বিমসটেক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশও রয়েছে।
মাহফুজ আনাম উত্তরে বলেন, শুরুতেই আমি তাকে (ড. ইউনূস) মিশ্র গ্রেড দেব। কিছু ক্ষেত্রে তিনি খুব ভালো করেছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম করেছেন। তবে এটাও বুঝতে হবে যে হাসিনা সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। তিনি ছিলেন খুব প্রভাবশালী নেতা, এবং তার চলে যাওয়ায় ক্ষমতায় একটি শূন্যতা তৈরি হয়। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, ইউনূস প্যারিসে ছিলেন, তিনি ৮ তারিখে দেশে ফিরেছিলেন এবং হাসিনা ৫ আগস্ট চলে যান দেশ ছেড়ে। মাঝের এই তিন দিন আমাদের দেশে কোনো সরকার ছিল না। এই তিন দিনই সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা এবং আক্রমণের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি।
কিছু কারাগার থেকে বন্দিরা পালিয়েছিল, কিছু মৌলবাদী কারাগার থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। তাই এই প্রথম কয়েক দিনে অনেক বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। তারপর ইউনূস শপথ নেন, তার প্রাথমিক দলের সদস্যরা বেশ অগোছালোভাবে নির্বাচিত হয়েছিল। আমি জানি, তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেককেই চিনতেন না। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, কিভাবে তিনি তাদের মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলেন, যাদের তিনি ভালোভাবে জানতেন না। তাই অনেক অস্বস্তি ছিল, বলতে পারেন মিশ্র একটি উপদেষ্টা পরিষদ। যারা একে অপরের সঙ্গে কাজ করেননি এবং তাদের অনেকেরই সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না।
সুতরাং, এসব কারণে শুরুতে বলা যায়, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ভুল দিকনির্দেশনা এবং কিছু নীতির অভাব ছিল। এখন সাত মাস পর অনেক বেশি স্থিতিশীল হয়েছে পরিস্থিতি। এ ছাড়া শুরুতে মূল্যস্ফীতি বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল, যা এখন স্থিতিশীল। আমরা গত দুই মাসে মূল্যস্ফীতির হার কমতে দেখেছি এবং আমাদের রপ্তানি এখন আগের স্তরে ফিরে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর আমাদের রপ্তানি ছিল ১৯.৯ বিলিয়ন (ডলার)। আর এখন এই বছরে একই স্তরে আছে। তাই ডলারের বিপরীতে টাকা স্থিতিশীল হয়েছে। আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে। অর্থনৈতিক পতনের অনুভূতিটাও কেটেছে।বলতে পারেন, আমরা স্থিতিশীল অবস্থায় আছি।
এরপর রাজ আবার প্রশ্ন করেন, এবার আমরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আসি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম, যা যুব আন্দোলনের মধ্যে রূপ লাভ করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র আন্দোলনের নেতারা, যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা করেছেন। এটি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপি নামে পরিচিত। আপনি জানেন যে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পারিবারিক নেতৃত্বাধীন দল হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং খালেদার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে।
এখন এনসিপি কিছু দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, যা কয়েক দশক পর প্রথমবারের মতো বড় ধরনের একটি পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে। ঢাকায় একটি সমাবেশে এনসিপি নেতারা দ্বিতীয় একটি প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন এবং পুরনো ন্যারেটিভগুলো যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ইসলামপন্থী এবং ভারত বনাম পাকিস্তান সম্পর্কের থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। আবার, যা ঘটেছে তার একটি ধারণা দেওয়ার জন্য জুলাই আন্দোলনের ২৬ বছর বয়সী নেতা নাহিদ ইসলাম ইউনূস সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে এনসিপির আংশিক প্রধান বা কনভেনর হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। এই নতুন রাজনৈতিক দলের আগমন কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ কী?
মাহফুজ আনাম বলেন, নতুন রাজনৈতিক দলের আগমন নিঃসন্দেহে এমন কিছু, যা আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব প্রত্যাশা করছি। কারণ যেমন আপনি বলেছেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে বাইনারি পরিস্থিতিতে ছিলাম—বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ- এটা ৫ বছরের একটি মেয়াদকালে দুলতে থাকত। শেষ ১৫ বছর শাসন করলেন হাসিনা। এর শুরু ১৯৯১ সাল থেকে। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের কারণে যে বছরটি আমরা ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র বছর বলে জানি। তখন থেকেই শুরু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই ৫ বছর মেয়াদে অদল-বদলের পালা। তা ছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে, এরশাদের জাতীয় পার্টি আছে আর একটি দল আছে জামায়াতে ইসলামী, যা বাংলাদেশের পুরনো দলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখন ছাত্রদের নতুন যে দলের আগমন হলো, তা রাজনীতিতে একটি নতুন উপাদানের মতো। আর আমাদের এটাও বুঝতে হবে যে, ছাত্রদের এই রাজনৈতিক দল গঠনের মানে হলো তাদেরকে এখন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর আসতে হবে। তারা হাসিনাকে অপসারণ করেছিল, তাই তাদের মধ্যে এক ধরনের সফলতার অনুভূতি রয়েছে, এমন কিছু যা বিএনপি করতে পারেনি, এমন কিছু যা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করতে পারেনি, তারা কয়েক মাসের আন্দোলনে এটি করেছে। সুতরাং সেই আত্মবিশ্বাস তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে যেখানে তাদের মনে হচ্ছে যে তারা বাংলাদেশকে আমূল বদলে দিতে পারে। কিন্তু তারা রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে নির্বাচনের ক্ষেত্রে। নির্বাচনের ব্যাপারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমরা সবাই এটি নিয়ে অধীর আগ্রহে আছি।
প্রথমত, এটা এখন মোটামুটি নির্ধারিত যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর বা বড়জোর জানুয়ারি পর্যন্ত গড়াতে পারে। তবে ছাত্রদের দল প্রকাশ্যেই বলছে, তারা নির্বাচনের আগে সংস্কার চায়। তাদের এই ব্যাপারটা বোধগম্য, কারণ তারা বেশ নতুন এবং নির্বাচনে যেতে কিছুটা ভীত। কারণ এতে হয়তো তারা দেখবে যে তাদের জনসমর্থন আসলে তেমন নেই।
অন্যদিকে, বিএনপি আক্ষরিক অর্থেই ক্ষমতায় আসার জন্য দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে। কারণ আওয়ামী লীগ এখন একপ্রকার বিচ্ছিন্ন। সুতরাং বিএনপি নির্বাচনের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে। ছাত্ররা তেমন আগ্রহী নয় এবং জামায়াতে ইসলামী, যারা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ফ্যাক্টর, তারা দ্বিধাগ্রস্ত—তারা অপেক্ষা করতে রাজি, ১০-১৫ বছরও অপেক্ষা করতে রাজি। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে যদি হয়, কিন্তু স্থগিত হলেও তাদের তেমন সমস্যা নেই। এটাই এখন পরিস্থিতি।
তবে মূল কথা হলো, দেশবাসী নির্বাচন চায়। হাসিনার সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল, গত তিনটি নির্বাচনে—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪, এ নির্বাচনগুলোয় এত বড় আকারে কারসাজি হয়েছিল যে, অনেক বেশি সংখ্যক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। সুতরাং বর্তমানে বাংলাদেশে সবার প্রবল আগ্রহ রয়েছে যে সবাই তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেতে চান। এই পরিস্থিতি অনুযায়ী, আমরা ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন দেখতে যাচ্ছি, যদি তা কোনো নাটকীয় কারণে স্থগিত না হয়।
এরপর রাজ বলেন, আপনি দেখেছেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা কিভাবে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছেন। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, নতুন এনসিপি দলের মধ্যে ইসলামিক মৌলবাদি উপকরণের আধিপত্য রয়েছে এবং জামায়াতে ইসলামী দলটি ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ তার ধর্মনিরপেক্ষ মূলনীতিগুলো হারাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইউনূস সরকার যে সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, তা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মতো শব্দগুলোকে মৌলিক মূলনীতি হিসেবে বাদ দিয়ে তাদের স্থলে প্রস্তাব করেছে সমতা, মানব মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় এবং সম্ভবত বৈচিত্র্যের মতো বিষয়গুলো। সুতরাং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিগুলো কি বিপন্ন এবং এটি কি ইসলামি পথে চলে যাচ্ছে? অনেক ভারতীয় বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করছেন, যেমনটা আমরা পাকিস্তানে দেখেছি।
মাহফুজ উত্তর দেন, এটি ভারতীয় এবং বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ, ভারতীয় সাংবাদিক ও বাংলাদেশি সাংবাদিকদের জন্যও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছাত্ররা কিছু দাবি করেছে, সাংবিধানিক কমিশন এই সুপারিশগুলো করেছে। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি এর বিরোধিতা করেছে এবং তারা খুব জোরালোভাবে বলেছে, তারা পুরনো অগ্রাধিকার ফিরিয়ে আনতে চায়, যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র। সুতরাং এখানে আপনি একটি পরিষ্কার পরিস্থিতি দেখছেন। যেখানে সবচেয়ে বড় দল এই পরিবর্তনগুলোর বিরোধিতা করছে এবং ছাত্ররা এর সমর্থনে দাঁড়িয়েছে, আর নির্বাচনই এটি নির্ধারণ করবে।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামী দলটি অনেক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে, তবে তারা কখনোই ৫ থেকে ৬ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে তারা একসময় ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এটিই তাদের ভোটের ইতিহাস। তারা হয়তো একটু বেশি, ১০ শতাংশ পর্যন্ত পেতে পারে, তবে আমি মনে করি এর বেশি হবে না।
তবে বাংলাদেশের ইসলামীকরণ বা পাকিস্তানের মতো যাওয়ার ব্যাপারে বড় প্রশ্নে আমি বলব, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং অন্য সাংবাদিকদের অনুরোধ করব, তারা বাংলাদেশের দিকে আরো গভীরভাবে আলোকপাত করুক। আপনি জানেন, পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং তেমনি বাংলাদেশও একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, তবে আমরা পাকিস্তান ভেঙেছি।
আমরা সেই জাতি, যারা বাংলাদেশে নিয়ে গর্বিত এবং আমরা মুসলিম হিসেবে গর্বিত। তবে মুসলিম হওয়া মানে এই নয় যে আমরা ধর্মীয় মৌলবাদী।
পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং পাকিস্তান নিয়ে আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা নিয়ে আমি এখানে আলোচনা করতে চাই না। তবে বাংলাদেশও একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। আমি ভয় পাচ্ছি যে, পাকিস্তান সম্পর্কে আপনার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা বাংলাদেশে প্রতিফলিত করা হচ্ছে, কারণ আমরা একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।
হ্যাঁ, আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, কিন্তু আমরাই পাকিস্তানকে ভেঙেছি। তাহলে আমরা কী? আমরা গর্বিত বাঙালি এবং একইসঙ্গে গর্বিত মুসলিমও।
এখন, যদি আমরা কিছুটা বেশি ধর্মপরায়ণ হই, তাহলে সেটা বড় কোনো বিষয় নয়। ভারতে বিজেপি ধর্মের ভিত্তিতে কংগ্রেসের তুলনায় অনেক বেশি হিন্দুত্ববাদী। ভারতে একসময় ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস ছিল, কিন্তু এখন সেটি অনেকটাই হিন্দুত্ববাদী ভারতের দিকে ঝুঁকেছে। আপনারা সেই পরিবর্তন এনেছেন এবং ভোটাররাও সেটি বেছে নিয়েছে। কিন্তু তাতে ভারতের বাংলাদেশ বা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বদলে যায়নি।
তাহলে, বাংলাদেশ যদি তার সংস্কৃতি এবং ধর্মকে কিছুটা বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এমনভাবে ভয় পাবেন না যে, “ওহ! বাংলাদেশ তো বাঙালি পরিচয় নিয়ে কথা বলত, এখন তারা মুসলিম পরিচয় নিয়ে কথা বলছে!”
আমার মনে হয়, এখানে মৌলিকভাবে আত্মবিশ্লেষণ ও নতুন করে চিন্তা করার দরকার। ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত গঠিত হয়। সে সময় বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। যদি আপনি পরিসংখ্যান দেখেন, তাহলে দেখবেন ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ বাংলা প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল।
কিন্তু একই বাঙালি মুসলমানরা পরবর্তীতে পাকিস্তানকে ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি করেছিল, কারণ পাকিস্তানের ভেতরে আমরা অনুভব করেছিলাম যে, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় হুমকির মুখে পড়েছে।
আমরা দ্বৈত সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি-একদিকে গর্বিত বাঙালি সংস্কৃতি, অন্যদিকে গর্বিত ইসলামি সংস্কৃতি। তবে ইসলামি সংস্কৃতি মানেই ধর্মীয় মৌলবাদ নয়।
আমি আমার ভারতীয় বন্ধুদের কাছে অনুরোধ করবো-আমাদের পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করবেন না, আমাদের নিজেদের মতো দেখুন। আপনারা যে অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের সঙ্গে পেয়েছেন, সেটির ভিত্তিতে আমাদের বিচার করবেন না। আমাদের স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করুন।
এরপর রাজ বলেন, আমি আপনাকে নতুন সরকারের প্রথম কিছু মাসে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রসঙ্গে বলতে চাই। যে বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা এবং ভারত সরকারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি আরএসএস (ভারতের শাসক বিজেপি দলের আদর্শিক সংগঠন) বেঙ্গালুরুতে তাদের জাতীয় বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা করেছে। তারা বিষয়টিকে একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছে, যার মধ্যে পাকিস্তান এবং ডিপ স্টেটের ভূমিকা রয়েছে। তারা বলছে, বর্তমান বাংলাদেশ প্রশাসন সমর্থিত মৌলবাদী ইসলামিক গ্রুপগুলো হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর এমন আক্রমণগুলো সংঘটিত করছে। এখন আপনি বিষয়টি কিভাবে দেখেন?
মাহফুজ আনাম উত্তর দেন, আমি এটিকে ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং আরএসএস-এর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাই। কারণ, যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপ নেয়, তবে আমরা সত্যিই বড় সমস্যায় পড়বো।
আমি আশা করি, ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিন এবং ভারতের অন্যান্য পণ্ডিতরা আমাদের আরো স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করবেন। এখানে কোনো ইসলামিক ষড়যন্ত্র নেই।
এখন, ভারতের ভেতরেও কিছু গোষ্ঠী থাকতে পারে যারা চায় যে ভারত আরো আদর্শগতভাবে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে উঠুক। তেমনি, হয়তো বাংলাদেশের ভেতরেও একটি গোষ্ঠী থাকতে পারে যারা ‘ইসলামিক বাংলাদেশ’ চায়। কিন্তু আমরা ১৮ কোটি মানুষ।
আপনি ডিসেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, দেখবেন কীভাবে অসাম্প্রদায়িক দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়। এটি হবে ন্যায়সঙ্গত। এরপর রাজ বলেন, ‘আমি শুধু বলতে চাচ্ছি, ভারতীয় সরকার হিন্দুদের নির্যাতনের ব্যাপারে যে মন্তব্য করেছে, সেটা সম্পর্কে আপনার মতামত কী?’
মাহফুজ আনাম বলেন, আমি মনে করি এটি আমাদের দুর্বলতা ছিল। এমন কিছু ঘটতে দেওয়া কখনই উচিত ছিল না। তবে এই সরকার এটি থামিয়েছে। প্রথম দুই-তিন মাসের ঘটনা বাদ দিলে, আপনি বাংলাদেশের সঠিক চিত্র দেখতে পাবেন।
কিন্তু হ্যাঁ, সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে সমস্যা ভারতেও ফিরে আসছে। এখন আমি এটাও বলতে পারি না যে আমরা এই অভিশাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়েছি, আমরা সংগ্রাম করছি। গোটা দক্ষিণ এশীয়াই সংগ্রাম করছে। ভারত সংগ্রাম করছে, আমরা সংগ্রাম করছি। আধুনিকীকরণের দৃষ্টিকোণে আমি মনে করি, আমাদের একে অপরকে সাহায্য করা উচিত এবং এগিয়ে যাওয়া উচিত। এটি আমার দৃষ্টিভঙ্গি। আমি বলব না যে আমরা এটি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছি, কিন্তু আমরা এতটা নিষ্ঠুর সাম্প্রদায়িক দেশও নই।
রাজ বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আগের আবস্থায় আনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কী?
মাহফুজ বলেন, আমি প্রথমেই মাঠের জনমত ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকে আলাদা করতে চাই। আমি মনে করি, ইউনুস সরকারের পক্ষ থেকে আমরা বহুবার পুনর্ব্যক্ত করেছি যে, আমাদের ভারতের সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্কের প্রয়োজন, বোঝাপড়ার প্রয়োজন এবং গভীর সহযোগিতার প্রয়োজন।
এটাই বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান। তিনি বহুবার এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং আমরা বিমসটেকের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছি।
কিন্তু আমি খুব স্পষ্টভাবে বলতে চাই, জনপরিসরে, যদি আপনি বাংলাদেশের রাস্তায় যান, তাহলে দেখবেন সেখানে একটি শক্তিশালী ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। তবে আমি বলবো, এই ভারতবিরোধী মনোভাব আসলে ভারতের বিরুদ্ধে নয়, বরং গত কয়েক বছরে ভারতের শেখ হাসিনাকে সমর্থন করার কারণে তৈরি হয়েছে।
আমরা অবশ্যই ভারতের সঙ্গে হাসিনার সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসিনা আরো একনায়কতান্ত্রিক হয়ে উঠেছেন। তার সাম্প্রতিক তিনটি নির্বাচন যদি দেখেন, একজন সাধারণ ভোটার হিসেবে আপনি কী দেখবেন?
যদি কোনো সরকার নির্বাচনে কারসাজি করতে চায়, তবে তারা—বিরোধী দলের সবাইকে গ্রেপ্তার করে, ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করে, নিজেদের পছন্দমতো একটি গল্প বানিয়ে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে, এবং ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ঘুষ নেওয়ার ব্যবস্থা করে।
এইভাবে, টানা তিনবার তিনি গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক নীতিগুলো সম্পূর্ণভাবে ভুলে গেছেন। সমস্যাটা হলো, তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন যে, নির্বাচন কারসাজির দক্ষতাকে তিনি প্রধান শক্তি হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন এবং জনগণের প্রতি কোনো জবাবদিহিতা রাখার প্রয়োজনও অনুভব করেননি। এখন, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ভারত হাসিনার এই কর্মকাণ্ডের অংশীদার ছিল। কারণ, হাসিনা ‘ভারতের লাইন’ অনুসরণ করছিলেন, আর সেই কারণেই ভারত তার দমনমূলক শাসনকে উপেক্ষা করছিল।
তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ব্যাপারটা এখন রূপান্তরের পর্যায়। এই অনুভূতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে আসবে, এবং নির্বাচনের দিকে যেতে যেতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে সবার আরো বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে। সরকারের দিক থেকে বলতে গেলে, তারা এখনও ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে অত্যন্ত আগ্রহী।
আমরা আশা করি, মি. জয়শঙ্কর, যিনি আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ও প্রশংসিত একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তার নেতৃত্বে ভারতের প্রতি আরো পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে।
তবে, এই আলোচনার মধ্যে কিছু কিছু দৃষ্টিভঙ্গি আমি মনে করি জনপরিসরে প্রচলিত মতামতের পুনরাবৃত্তি মাত্র। সরকার কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে দোষারোপ করেনি। কিছু মতামত প্রদানকারী ব্যক্তি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু প্রচারণা থাকতে পারে, কিন্তু সরকার এ ধরনের কোনো অবস্থান নেয়নি।
এরপর রাজ বলেন, দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই-প্রথমত, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এটা নিশ্চিতভাবেই বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, অতীতে পুলিশকে শেখ হাসিনার হাতের পুতুল হিসেবে দেখা হয়েছে, যা প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেক পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে, যার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে কিছুটা দায়িত্ব নিতে হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, যারা এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় পর্দার আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তারা ক্রমবর্ধমান সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের মার্চের শুরুর দিকে এক বিরল প্রকাশ্য ভাষণে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সতর্ক করে বলেছিলেন, দেশ এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, সেনাপ্রধানের এই কঠোর সতর্কবার্তা ইউনুসের বেসামরিক নেতৃত্বের প্রতি কতটা গুরুতর ইঙ্গিত বহন করে? এটি কি সম্ভব যে, সামরিক বাহিনীর মধ্যে হস্তক্ষেপের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে? কারণ, অতীতে আমরা দেখেছি যে, যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং অর্থনৈতিক অবস্থা আরো খারাপ হয়, তাহলে সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আপনি কী মনে করেন, যদি বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপের পথে যেতে পারে?
উত্তরে মাহফুজ আনাম বলেন, যদি সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে চাইত, তাহলে তাদের জন্য সেরা সুযোগ ছিল যখন হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং ইউনুস তখনও কার্যকরভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। সেই তিন-চার দিন একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। সেনাবাহিনী চাইলে তখনই হস্তক্ষেপ করতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি।
এরপর বিভিন্ন বক্তৃতায় সেনাপ্রধান বারবার বলেছেন, তারা কেবল ইউনুসের সরকারকে সমর্থন করতেই আগ্রহী। আপনি যে সতর্কবার্তার কথা বলেছেন, আমি মনে করি সেটি যথাযথ সময়েই দেওয়া হয়েছিল। তবে তা শুধু সরকারের প্রতি নয়, বরং ছাত্রদের প্রতিও ছিল, পাশাপাশি দেশের কিছু অস্থিরতা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর প্রতি।
সেনাপ্রধানের ভাষা হয়তো কিছুটা কঠোর ছিল, তবে সতর্কবার্তাটি যথাসময়ে এসেছে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পরবর্তী ঘটনাগুলোর ওপর। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে, সেনাবাহিনী আসলে তেমন কোনো রাজনৈতিক আগ্রহ দেখায়নি।
সবশেষে রাজ জানতে চান, ‘শেখ হাসিনার পতনের পর সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছিল বেশ শীতল, যা মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ক্ষোভ এবং পাকিস্তানপন্থী নেতাদের বিচারের কারণে হয়েছিল। কিন্তু ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বের অধীনে, এই অতীতের পাতা ওল্টানোর একটি সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?’
উত্তরে মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পরপরই আমি দেখেছি, ভারতের বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ গণমাধ্যমও বলছে যে, এটি একটি আইএসআই ষড়যন্ত্র, এবং এটি পাকিস্তান ও আইএসআই-এর পরিকল্পনায় ঘটেছে।
আমি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছি, আপনারা কি মনে করেন আমরা নিজেরা কিছুই করতে পারি না? যে কোনো কিছু হয় ভারতের 'র' করছে, না হলে পাকিস্তানের আইএসআই করছে-আর আমরা কেবল অসহায়, নিষ্ক্রিয় জনগোষ্ঠী! দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই দৃষ্টিভঙ্গি এখনও বিদ্যমান।
শেখ হাসিনার শাসনামলে আমাদের সম্পর্ক পাকিস্তানের সঙ্গে একেবারেই শীতল ছিল। কিন্তু এখন আমরা কিছু বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি। পাকিস্তান একটি সার্বভৌম দেশ। আমি আমার ভারতীয় বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানাই যে, এটিকে কোনো নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখবেন না। এটি আসলে দক্ষিণ এশিয়ার একজন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গঠনের প্রচেষ্টা মাত্র।
তবে, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার এখনো সেই অনুভূতি রয়ে গেছে-আমি চাই পাকিস্তান ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইবে, আমি চাই তারা সেই সময়ের নৃশংসতাগুলো স্বীকার করবে। আমরা এখনও আশা করি, একদিন সেটি ঘটবে। কিন্তু এই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্বাভাবিক কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ মাত্র।
আমরা গর্বিত বাংলাদেশি, আমরা গর্বিত মুসলমান। আমরা আমাদের দেশ যেভাবে চালানো উচিত, সেভাবেই চালাবো—এবং দয়া করে আমাদের ওপর আস্থা রাখুন।
সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে।